Translate

বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদদের উৎপত্তি


ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদদের উৎপত্তি

                                              মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে

 

 

 

  প্রায় দুশত বছর ইংরেজদের গোলামীতে আবদ্ধ ছিল ভারত উপমহাদেশের সমস্ত মুসলমান। এ দেশের মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করে তাদের শাসন-শোষণ স্থায়ী করার হীন প্রচেষ্টায় ইংরেজ বেনিয়ারা বহুমুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কেবল ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে তারা ৫৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ করে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত ৩ বছরে হিংস্র হানাদাররা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহীদ করে ১৪ হাজার আলেমকে। আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে শহীদ করে অসংখ্য আলেম-উলামা ও নিরীহ মুসলমানদেরকে। ইজ্জতহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য মুসলিম মা-বোন। কারাবরণ করেন হাজার-হাজার মুসলমান। কেবল দিল্লী শহরেই তারা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে প্রায় দশ হাজার মাদ্রাসা।

 

 

চলমান শতাব্দীর ঘোর জাহিলিয়্যাত ও ভয়াবহ ফিতনা সৃষ্টিকারী তথাকথিত আহলে হাদীস নামধারী, যারা মুকাল্লিদ তথা মাযহাব অবলম্বীদেরকে নবোদ্ভাসিত বা তাক্বলীদ নামক বিদয়াতে লিপ্ত বলে অপবাদ দিয়ে আসছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তাদের ন্যায় এমন অনেক ভ্রান্ত দলই রয়েছে, যারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। আর যারা নিজেদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, তারা অন্যদের সমালোচনা কিভাবে করতে পারে, তা আমার কেন, কারও বুঝে আসার কথা নয়।   আর ভারত মহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পূবে কোন ধরনের ধর্মীয়  ফেরকাবন্দি দলা দলি ছিলনা , ইংরেজ কতৃক এ দলাদলির গোডা  পর্তন  হয় ৷  তাই এখানে সূচনালগ্নে গাইরে মুকাল্লিদ্দেরকে তাদের জন্মকাল এবং উৎপত্তিস্থল স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যাতে করে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাক্বলীদ করা বিদ্য়াত নাকি তাক্বলীদ্-বিমূখী হওয়া বিদ্য়াত।

 

মুযাহেরে হক্ব কিতাবের স্বনামধন্য লেখক মাওলানা কুতুব উদ্দীন তাঁর তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযম গ্রন্থে গাইরে মুক্বাল্লিদ্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদ ও মাওলানা আব্দুল হাই (রহঃ) পাঞ্জাবে আগমন করার পরপরই কতিপয় বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীর সমন্বয়ে চার মায্হাবের ইমামগণের তাক্বলীদ অস্বীকারকারী নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত লক্ষ্য করা যায়, যারা হযরত সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর মুজাহিদ বাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিল, এদের মূখপাত্র ছিল মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী (মৃত-১২৭৫হিঃ)।=======

একদিকে হুসাইন আহমাদ মাদানী রহঃ এর ফাতওয়া যে, “ইংরেজদের দলে ঢুকা হারাম। ভারত দারুল হরব জেহাদ ফরজ  , আর আশরাফ আলী থানবী রহঃ এর ফাতওয়া যে, “ইংরেজদের পণ্য ব্যবহার হারাম

অপরদিকে ইংরেজদের পদলেহী, পা চাটা গোলাম একদল ঈমান বিক্রেতাদের ক্রয় করে নিল। তাদের মাঝে ছিল বাটালবী।  আর আহমদ রেজা খান ,তাদের মাঝে একজন কিতাব লিখল-আল ইকতিসাদ ফি মাসায়িলিল জিহাদ। যাতে সে লিখে যে, ইংরেজদের শাসন ইসলামী রাষ্ট্র। আর ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম।====

 

 

 {সে যুগে আহমদ রেযা খানের সাথে আবদুল মজীদ বদায়ূনী ও আবদুল হামিদ বদায়ূনী নামক দুই ভাই-যাদের প্রথমোক্তজন সরকারী শামসুল উলামাখেতাব এবং ১৯২২ সালে গভর্ণর হারকোট বাটলারের দরবার থেকে একটি তমঘা ও সম্মানসূচক তরবারী লাভ করেছিলেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭২) }  এই বই লিখার পর তাকে শামসুল উলামা উপাধী দেয়া হয়, তাকে মেডেল দেয়া হয়। অনেক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

যখন এদেশের মানুষ দেখল যে, ওরা ইংরেজদের দালাল। তখন তাদের ওহাবীবলে গালি দেয়া শুরু হয়। ওহাবী সেই যুগে তাদের বলা হত-যারা দেশের গাদ্দার।  

 

 তার এ ধরণের অসংখ্য ভ্রান্ত কর্মকান্ডের কারণে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহঃ) ১২৪৬ হিজরীতে গাদ্দারীর কারনে  তাকে মুজাহিদ বাহিনী থেকে বহিষ্কার করেন। তখনই গোটা ভারতবর্ষের সকল ধর্মপ্রাণ জনগণ, বিশেষ করে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ (রহঃ) এর খলিফা ও মুরীদগণ হারামাইন শরীফাইনের তদানীন্তন উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের নিকট এ ব্যাপারে ফত্ওয়া তলব করেন। ফলে সেখানকার তৎকালীন চার মায্হাবের সম্মানীত মুফতীগণ ও অন্যান্য উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী    ও তার অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ফিরক্বা বলে অভিহিত করেন এবং মৌঃ আব্দুল হক্বকে ক্বতল (হত্যা) করার নির্দেশ প্রদান করেন।

 

(এ ফতওয়া ১২৫৪ হিজরীতে তান্বীহুদ্দাল্লীন নামে প্রকাশ করা হয়, এখনো দেশের বিশিষ্ট লাইব্রেরীতে এর কপি সংরক্ষিত রয়েছে।)মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারস পলায়ন করতঃ কোনভাবে আত্নরক্ষা পায়। সেখানে গিয়ে তার নবাবিষ্কৃত দলের প্রধান হয়ে সরলমনা জনসাধারণের মধ্যে তার বিষাক্ত মতবাদ ছড়াতে থাকে।(তুহ্ফাতুল আরব ওয়াল আযমঃ পৃঃ ১৬ খঃ ২, আল-নাজাতুল কামেলাঃ পৃঃ ২১৪, তান্বীহুদ্দাল্লীন, পৃঃ ৩১)

 

উপরোক্ত বিবরণ থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৌঃ আব্দুল হক্ব বেনারসী কর্তৃক ১২৪৬ হিজরীতে ভারতবর্ষে গাইরে মুক্বাল্লিদ তথা লা-মায্হাবী নামক নতুন ফিরক্বাটির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সে গাদ্দার ওহ্হাবী হিসেবে পরিচিত ছিল।

 

 কিন্তু সে নিজেকে মুহাম্মদী বলে প্রচার করতো। পরবর্তীতে ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হারাম এ মর্মে ফত্ওয়া দিয়ে ইংরেজের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এবং এ সুযোগে সে সরকারী কাগজ-পত্র থেকে ওহ্হাবী নাম রহিত করে আহলে হাদীস নাম বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নবোদ্ভাসিত এ ফিরক্বাটিই আজ নিজেদের ব্যতীত অন্যান্য সবাইকে নবোদ্ভাসিত বা বিদ্য়াতী বলে অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক নয় কি ৷  

 

আহলে হাদীস নাম ইংরেজ কতৃক অনুমোদীত


আহলে হাদীস নাম ইংরেজ কতৃক অনুমোদীত

 

ভারতবর্ষে ইংরেজ-বিরোধী ও ইংরেজ বিতাড়নে জিহাদ যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদেরকে ইংরেজ সরকার ওহহাবী বলে আখ্যায়িত করেছিল, যা পূর্বে ও আলোচনা করা হয়েছে ৷  আর মূলতঃ এরা বিদ্রোহী গ্রুপ এরা মূল ধারার হক্কানী ওলামাদের দল থেকে বেরিয়ে আসে , ইংরেজদের দালালী করার জন্য ৷

 তখন গাইরে মুক্বাল্লিদরা ওহহাবী নামের আখ্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই তারা তখন নিজেদের জন্য মুহাম্মদীএবং পরবর্তীতে আহলে হাদীসনাম বরাদ্দ করার সম্ভাব্য সকল অপতৎপরতা চালিয়ে গিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে গাইরে মুক্বাল্লিদদের তৎকালীন মুখমাত্র মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লাহোরী বৃটিশ সরকারের প্রধান কার্যালয় এবং পাঞ্জাব, সি-পি, ইউ-পি, বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাঙ্গালসহ বিভিন্ন শাখা অফিসে ইংরেজ প্রশাসনের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করত: তাদের জন্য আহলে হাদীসনাম বরাদ্দ দেয়ার দরখাস্ত পেশ করেন। এ দরখাস্তগুলোর প্রতি উত্তর সহ তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত তৎকালীন এশায়াতুস সুন্নাহপত্রিকায় (পৃ:২৪-২৬, সংখ্যা:২, খ:১১) প্রকাশ করা হয় যা পরে সাময়ীক নিবন্ধ আকারেও বাজারজাত করা হয়। তাদের মানসিকতা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করার জন্য আপনাদের সমীপে সন্মধ্য হতে

 

একটি দরখাস্তের অনুবাদ নিম্নে পেশ করছি।

 

বখেদমতে জনাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী,

আমি আপনার খেদমতে লাইন কয়েক লেখার অনুমতি এবং এর জন্য ক্ষমাও পার্থনা করছি। আমার সম্পাদিত মাসিক এশায়াতুস সুন্নাহপত্রিকায় ১৮৮৬ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলাম যে, ওহহাবী শব্দটি ইংরেজ সরকারের নিমক হারাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এ শব্দটি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের ঐ অংশের জন্য ব্যবহার সমীচিন হবে না, যাদেরকে আহলে হাদীসবলা হয় এবং সর্বদা ইংরেজ সরকারের নিমক হালালী, আনুগত্যতা ও কল্যাণই প্রত্যাশা করে, যা বার বার প্রমাণও হয়েছে এবং সরকারী চিঠি প্রত্রে এর স্বীকৃতিও রয়েছে।

অতএব, এ দলের প্রতি ওহহাবী শব্দ ব্যবহারের জোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সাথে সাথে গভার্মেন্টের বরাবর অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে আবেদন করা যাচ্ছে যে, সরকারীভাবে এ ওহহাবী শব্দ রহিত করে আমাদের উপর এর ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক এবং এ শব্দের পরিবর্তে আহলে হাদীসসম্বোধন করা হোক।

 

আপনার একান্ত অনুগত খাদেম

আবু সাঈদ মুহাম্মদ হুসাইন

সম্পাদক, এশায়াতুস সুন্নাহ .

 

 

দরখাস্ত মুতাবেক ইংরেজ সরকার তাদের জন্য ওহহাবশব্দের পরিবর্তে আহলে হাদীসনাম বরাদ্দ করেছে। এবং সরকারী কাগজ-চিঠিপত্র ও সকল পর্যায়ে তদের আহলে হাদীসসম্বোধনের নোটিশ জারি করে নিয়মতান্তিকভাবে দরখাস্তকারীকেও লিখিতভাবে মঞ্জুরী নোটিশে অবহিত করা হয়।

 

সর্বপ্রথম পাঞ্জাব গভার্মেন্ট সেক্রেটারী মি: ডব্লউ, এম, এন (W.M.N) বাহাদুর চিঠি নং-১৭৫৮ এর মাধ্যমে ৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৬ ইংরেজিতে অনুমোদনপত্র প্রেরণ করেন। অতপর ১৪ই জুলাই ১৮৮৮ইং সি.পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৪০৭ এর মাধ্যমে এবং ২০শে জুলাই ১৮৮৮ইং ইউ.পি গভার্মেন্ট চিঠি নং-৩৮৬ এর মাধমে এবং ১৪ই আগষ্ট ১৮৮৮ইং বোম্বাই গভার্মেন্ট চিঠি নং-৭৩২ এর মাধ্যমে এবং ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৮মাদ্রাজ গভার্মেন্ট চিঠি নং ১২৭ এর মাধ্যমে এবং ৪ঠা মার্চ ১৮৯০ইং বাঙ্গাল গভার্মেন্ট চিঠি নং-১৫৫ এর মাধ্যমে দরখাস্তকারী মৌলভী আবু সাইদ মুহাম্মদ বাটালভীকে অবহিত করা হয়।

(এশায়াতুস সুন্নাহ, পৃ:৩২-৩৯, সংখ্যা:২, খ:১১)

 

 

কোন মুসলিম জামাতের নাম অমুসলিম, মুসলামানদের চিরশত্রু খৃষ্টান নাছারাদের মাধ্যমে বরাদ্দ করা ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিরল। যা কেবল হিন্দুস্তানী গাইরে মুক্বাল্লিদদেরই গৌরব ও সৌভাগ্যের বিষয় ,তাই তারা এ ইতিহাসটা অত্যন্ত গৌরবের সহিত নিজেদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে তৃপ্তি লাভ করেছেন।  সুতরাং আহলে হাদীসরাই ২ কারনেই  প্রকৃত ওহহাবী ৷  একেতো আবদুল ওহহাব নজদীর মতবাদের প্রচারক ও দ্বিতীয়ত ইংরেজ কতৃক পরিবর্তিত নাম অনূসারে ৷

 

 

                       

ভারতবর্ষে ওহাবী-সুন্নী দ্বন্দ্বের সূচনা


ভারতবর্ষে ওহাবী-সুন্নী দ্বন্দ্বের সূচনা

 

 

১.      তৎকালীন  ১৮৫৭ ইংরেজীর আযাদী আন্দোলনে  ভারত উপমহাদেশে দখলদার ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে আজাদী আন্দোলনের প্রক্কালের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে , এল বিভান জোনস লেখেন, গোঁড়া মৌলবীরা সাইয়েদ আহমদ শহীদের অনুসারীদের কট্টর সংস্কার আন্দোলনকে ওহাবীটজম বলে কুৎসা রটায়। (Nicknamed them Wahhabies) The people of the mosque, p. 206 (London 1932)

২. ঐতিহাসিক পি হার্ডি লেখেন, The follwers of Syed Ahmad Barelvi Continued to maintain an active guerrilla war on the North West frontier in the region of Black mountain … . the Ulama were a potential political force and that it was necessary to divided them politically from the supporters of Syed Ahmad Brelvi

অর্থাৎ সৈয়দ আহমদ বেরলভীর অনুসারীরা ভারতবর্ষের উত্তর সীমান্তের কালোপাহাড় এলাকায় একটি গেরিলাযুদ্ধ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছিল। আলেমসমাজ আরো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিরূপে বিরাজমান ছিল। তাই তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করে সাইয়েদ আহমদ বেরলভীর অনুসারীদের থেকে সরিয়ে আনাটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। (দি মুসলিমস অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া পৃ. ২৬৮)

৩. দেওবন্দী আলেমগণ ক্রমাগত ব্রিটিশ শাসন বিরোধী ফতোয়া দিয়ে যাচ্ছিলেন। পি হার্ডি বলেন,

The collection of fatwas by Deobandi ulama are of immence importance for understanding the pre-ocopations of Indian Muslims.

অর্থাৎ দেওবন্দী আলেমগণের ফতোয়া সংকলনগুলো পরাধীন ভারতের মুসলমানদের মন ও মনন গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হত। (প্রাগুক্ত পৃ. ১৭১)

৪. এমতাবস্থায় বৃটিশ সরকারের জন্যে যা অত্যন্ত দরকারী হয়ে পড়েছিল তা হচ্ছে-

For every Alim who issued a fatwa that India was Dar-ul-Harb there would be one who declared that it was Dar-ul-Islam. Deoband represented the first response.

অর্থাৎ এমন প্রত্যেক আলেম যিনি বলেন হিন্দুস্তান দারুল হরব বা শত্রুকবলিত রাষ্ট্র, তার জবাবে আরো একজন করে আলেম থাকা অপরিহার্য যিনি বলবেন, না, হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম। দেওবন্দ ছিল প্রথমোক্ত দলের প্রতিনিধিত্বকারী।

৫. পক্ষান্তরে আহমদ রেযা খান ঐ দ্বিতীয় অপ্রিয় দায়িত্বটি গ্রহণ করলেন। হার্ডির ভাষায়-

Ahmad Reza Khan of Barilvi issued a fatwa declaring India to be Dar-ul-Islam, marking it a sin to associate with infidels.

অর্থাৎ আহমদ রেযা খান ভারতবর্ষকে দারুল ইসলাম বলে ঘোষণা করে বিধর্মীদের (হিন্দুদের) সঙ্গে মিলে চলা (স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা) কে পাপ বলে ঘোষণা দেন। (প্রাগুক্ত পৃ. ২৬৮)

এ-ই হল ভারতীয় উপমহাদেশে ওহাবী-সুন্নী দ্বন্দ্বের ইতিহাস। যাদের জন্যে আলেমরা এ মহান জিহাদ (?) শুরু করেছিলেন সেই ইংরেজ জাতির ঐতিহাসিকরা তা ধরিয়ে দিয়েছেন। ঐ যুগে তিনি আজীবন যালেম বিজাতীয় বিদেশী সরকারের সমর্থন অব্যাহতভাবে যুগিয়ে গেছেন। এমনকি তার মৃত্যুর বছর ১৯২১ সালে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকার পরে আলেমরা একটি সম্মেলন আহবান করেছিলেন।

ফ্রান্সিস রবিনসন এ তথ্যটি ফাঁস করে দিয়ে মন্তব্য করেন-

He had considerable influence with the masses but was not favoured by educated Muslims.

সাধারণ মানুষের উপর  {আহমদ রেযা খান} তার বেশ প্রভাব ছিল, কিন্তু শিক্ষিত মুসলমানরা তাকে পসন্দ করতেন না। (সেপারিটিজম এমাঙ ইন্ডিয়ান মুসলিমস, পৃ. ৪২২)

সে যুগে আহমদ রেযা খানের সাথে আবদুল মজীদ বদায়ূনী ও আবদুল হামিদ বদায়ূনী নামক দুই ভাই-যাদের প্রথমোক্তজন সরকারী শামসুল উলামাখেতাব এবং ১৯২২ সালে গভর্ণর হারকোট বাটলারের দরবার থেকে একটি তমঘা ও সম্মানসূচক তরবারী লাভ করেছিলেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭২)

গেইল মেনান্ট লেখেন, সরকারী মোসাহেবীর পুরস্কার স্বরূপ আবদুল মজীদ লক্ষ্ণৌর সরকার সমর্থক ক্যানিং কলেজের অধ্যাপকের চাকুরি এবং আবদুল হামিদ লক্ষ্ণৌ ঈদগাহর ইমামতি লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। (দি খিলাফত মুভমেন্ট দিল্লী অক্সফোর্ড ফ্রেম ১৯৮২, পৃ. ২৭২)

বর্তমানে ওহাবী তত্ত্বপুনঃআবিষ্কারকারীগণ সেই নোংরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে জানান দিলেন, ব্রিটিশ বেনিয়ারা ৬৫ বছর পূর্বেই এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হলেও

তাদেরনিমক হালাল অনুগামীরা এখনো বেঁচে আছেন এবং যে কোন বাতিল শক্তিকেই তারা মদত যোগাতে সদা প্রস্ত্তত

 

 

 

প্রকৃত আহলে হাদীস কারা ?


প্রকৃত  আহলে হাদীস কারা ?      

 

যুগযুগ ধরে হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিক্বাহ, উসূলে ফিক্বাহ এবং হাদীসের ব্যাখ্যা ও হাদীসের বর্ণনাকারীদের ইতিহাসের কিতাব সমূহের ভাষ্য মতে, যারা হাদীসের সনদ ও মতন (বর্ণনাকরী ও মূল বিষয়) নিয়ে নিবেদিত এবং হাদীস শরীফের সংরক্ষন, হিফাযত, সঠিক বুঝ এর অনুসরন-অনুকরন নিজের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদেরকেই আহলে হাদীস বা আছহাবুল হাদীস বলা হয়। চাই সে হানাফী হোক বা শাফেয়ী, মালেকী অথবা হাম্বলী।

 

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা যাকে গাইরে মুক্বাল্লিদরাও অনুসরন করে থাকে, তিনি বলেন,

কেবল মাত্র হাদীস শ্রবণ, লিখন অথবা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ ব্যক্তিদেরকেই আহলে হাদীসবলা হয় না বরং আমাদের নিকট আহলে হাদীসবলতে ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে বুঝায় যারা হাদীস সংরক্ষন, পর্যবেক্ষন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থ অনুধাবন করার যোগ্যতা সম্পন্ন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থের অনুসারী হবে।

(নাক্বদুল মানতিক, পৃ:১৮, কায়রো থেকে প্রকাশ ১৯৫১ইং

 

 

বর্তমানে যারা আহলে হাদীসের দাবিদার...

গাইরে মুক্বাল্লিদরা আহলে হাদীসবলতে তক্বলীদ অমান্যকারী একটি দল ও একটি নির্দিষ্ট মতবাদ। অনুরূপভাবে যেথায়ই আহলে হাদীস বা আহলুল হাদীস শব্দ দেখতে পাওয়া যায় এর দ্বারা তারা নিজেদেরকেই মনে করা চাই সে জাহেল বা মূর্খ হোক, নামাযী হোক বা বেনামাযী হোক  হাদীস সম্বন্ধে তার কোন জ্ঞান থাক বা না থাক, কেবল আহলে হাদীস দলে ভর্তি হলেই আহলে হাদীস উপাধী পেয়ে যাবে।

(আখবারুল ইত্তেছাল, পৃ:৫, কলাম-১, সংখ্যা- ২, ফে: ১৯৬২ আহলে হাদীসের তদানিন্তন জেনারেল সেক্রেটারী মাওলানা ইসমাইল কর্তৃক প্রকাশিত)

 

তাই এ দলের সবার উপাধি আহলে হাদীসযদিও তাদের অনেকেরই পেটে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালেও একটি হাদীস নির্গত হবে না। উপরন্তু তাদের নামধরী আলেমেদের অনেকেই ফিক্বহে হাদীস সম্বন্ধে কিঞ্চিত জ্ঞানও রাখে না, বুঝার চেষ্টাও করে না। এর প্রমান হিসেবে তাদেরই নেতা নবাব ছিদ্দিক হাসান খানের (যিনি ১২৮৫ হিজরীতে মৌলভী আব্দুল হক্ব বেনারসী থেকে লিখিতভাবে মুহাম্মাদী উপাধি লাভ করেন -- মাযহাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ, পৃ:৩৬) উক্তি পেশ করছি :

আপনি তাদেরকে কেবল হাদীসের শব্দ নকল করতে দেখবেন, হাদীস বুঝার প্রতি তারা কোন ভ্রুক্ষেপই করে না। এতটুকু তারা নিজেদের জন্য যথেষ্ট মনে করে। অথচ এ ভ্রান্ত ধারনা মূল লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে, কেননা হাদীসের কেবল শব্দের গন্ডীতে সীমাবদ্ধ না থেকে হাদীস বুঝা, এর অর্থ  ও মর্ম নিয়ে গবেষনা করাই হল মূল উদ্দেশ্য।

(আল-হিত্তাহ ফী যিকরিচ্ছিহাহ ছিত্তাহ, পৃ : ৫৩)