Translate

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারী, ২০১২

শুধু আরবদের নয়, হিজরী মুসলমানদের সন, ইসলামী সন

m  abdullah nezami bhuiya
হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররম। শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে। এই হিজরী সনের সূচনা, প্রেক্ষাপট, মুসলিম-জীবনে এর প্রভাব, হিজরী ক্যালেন্ডার ও একদিনে বিশ্বব্যাপী ঈদ-রোযা করা বিষয়ে মাসিক আলকাউসারের সম্পাদক, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার মুদীর মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ একটি সাক্ষাৎকার দেন। এ সাক্ষাৎকারের একটি চুম্বক অংশ গত ২৫ নভেম্বর দৈনিক আমার দেশ-এ মুদ্রিত হয়। সাক্ষাৎকারের পূর্ণরূপ এখানে মুদ্রিত হল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-শরীফ মুহাম্মদ।




হিজরী সনের সূচনা কখন কীভাবে?

হজরত ওমর রা. তার খিলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে হিজরী সন গণনা শুরু করেন। এর প্রেক্ষাপট ছিল এরকম—হজরত ওমর রা.-এর কাছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চিঠি আসত। সেখানে মাসের নাম ও তারিখ লেখা হতো। কিন্তু সনের নাম থাকত না। এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো। তখন পরামর্শের ভিত্তিতে একটি সন নির্ধারণ ও গণনার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন উপলক্ষ থেকে সন গণনার মতামত আসলেও শেষ পর্যন্ত হিজরতের ঘটনা থেকে সন গণনার সিদ্ধান্ত হয়।

হিজরতের বছর থেকেই সন গণনার তাৎপর্য কী?

সন গণনার আলোচনার সময় প্রস্তাব উঠেছিল,ঈসায়ী সনের সূচনার সঙ্গে মিল রেখে নবীজীর জন্মের সন থেকে ইসলামী সনের শুরু হওয়া। এ রকম আরও কিছু কিছু উপলক্ষের কথাও আলোচিত হয়। কিন্তু হিজরতের সন থেকে সন গণনা চূড়ান্ত হওয়ার পেছনে তাৎপর্য হল,হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয় ‘আল ফারিকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল’ অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে। হিজরতের পর থেকেই মুসলমানরা প্রকাশ্য ইবাদত ও সমাজ-গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন।

প্রকাশ্যে আযান,নামায,জুমা,ঈদ সবকিছু হিজরতের পর থেকেই শুরু হয়েছে। এসব তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য করেই মুসলমানদের সন গণনা হিজরত থেকেই শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

হিজরী সনের মাসগুলো তো আগে থেকেই ছিল। সে হিসেবে এ সনটিকে কেবল আরবী সন হিসেবে সাব্যস্ত করা যায় কি না?

মাসগুলো আরবী মাস হলেও সনটিকে গোটা মুসলিম উম্মাহর সন হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে। মাসগুলো আসলে চান্দ্র বর্ষের মাস। আরবীতে ‘আশশুহূরুল কামারিয়্যা’ বলা হয়। এজন্য হিজরী সনও একটি চান্দ্রবর্ষ। যেমন ঈসায়ী সনের মাসগুলোকে বলা হয় ‘আশশুহূরুশ শামসিয়্যা’ বা সৌরবর্ষের মাস। এই চান্দ্রবর্ষকে তাই কেবল আরবদের সন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।

এই চান্দ্রবর্ষ বা হিজরী সনের প্রভাব কোন কোন ক্ষেত্রে কতটুকু?

এই চান্দ্রবর্ষের ও চান্দ্রমাসের প্রভাব মুসলমানদের জীবনে ব্যাপক। জীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষত ইবাদতের তারিখ,ক্ষণ ও মৌসুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে হিজরী সনের প্রভাব ও গুরুত্ব অপরিসীম। একারণে হিজরী সনের হিসাব স্মরণ রাখা মুসলমানদের জন্য জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রভাব রয়েছে। যেমন রমযানের রোযা,দুই ঈদ,হজ্ব,যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে চান্দ্রবর্ষ বা হিজরী সন ধরেই আমল করতে হয়। রোযা রাখতে হয় চাঁদ দেখে, ঈদ করতে হয় চাঁদ দেখে। এভাবে অন্যান্য আমলও। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলাদের ইদ্দতের ক্ষেত্রগুলোতেও চান্দ্রবর্ষের হিসাব গণনা করতে হয়। অর্থাৎ মুসলমানদের ধর্মীয় কতগুলো দিন-তারিখের হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্র রয়েছে,সেগুলোতে চাঁদের হিসাবে দিন,তারিখ,মাস ও বছর হিসাব করা আবশ্যকীয়।

চান্দ্রবর্ষের হিসাব মেলালে দেখা যায়,একটি ইবাদতের মৌসুম কয়েক বছরের ব্যবধানে শীত-গরম-বর্ষায় পরিবর্তিত হতে থাকে। সৌরবর্ষের হিসাবে এটা হয় না। এতে কি কোনো হিকমত বা কল্যাণ রয়েছে?

আসলে ইসলাম হচ্ছে ‘দ্বীনুল ফিতরাহ’ বা স্বভাব-অনুকূল ধর্ম। ইসলামের বিধিবিধান এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত,শহুরে-গ্রাম্য, সমতলবাসী বা পাহাড়ি,তথ্য ও প্রযুক্তির সুবিধাপ্রাপ্ত ও বঞ্চিত-সবাই যেন স্বাচ্ছন্দে আল্লাহর বিধিবিধানগুলো পালন করতে পারে। চাঁদের মাস ও বছরের হিসাবেই সহজে এটা করতে পারা যায়। জোতির্বিদ্যা বা আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য যাদের কাছে থাকে না তারাও চাঁদ দেখে স্বাচ্ছন্দ্যে এ বিধানগুলো পালন করতে পারে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে,চান্দ্রবর্ষের হিসাব অনুযায়ী হওয়ায় একটি ইবাদত বিভিন্ন মৌসুমে পালনের সুযোগ মুসলমানরা পান। কখনও রোযা ছোট দিনের হয়,কখনও দীর্ঘ দিনের। কখনও ঈদ ও হজ্ব হয় শীতকালে,কখনও গ্রীষ্মকালে। মৌসুমের এই বৈচিত্র্যের কারণে মুসলমানরা একটি ইবাদত বা উৎসব আল্লাহর দেওয়া সব ক’টি মৌসুমেই পালন করতে পারেন।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়,ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিন-তারিখগুলোকে খ্রিস্টীয় সন-তারিখে রূপান্তরিত করে পালন করা হয় বা স্মরণ করা হয়। এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

আমার মনে হয় এটা যুক্তিযুক্ত নয় এবং এমনটি করা উচিত নয়। কারণ, এসব ঘটনা যেসব মাস বা দিনে হয়েছে সেগুলোর আলাদা তাৎপর্য আছে। যেমন বদর যুদ্ধের দিনের কথা বলতে পারেন। যুদ্ধটি হয়েছে রমযান মাসে। কোরআন নাযিলের মাসে। এখন এ যুদ্ধদিনের তারিখকে খ্রিস্টীয় সনে অনুসরণ করে স্মরণ করলে একসময় দেখা যাবে যে,দিনটি আর রমযান মাসে নেই। তখন এ যুদ্ধের ইতিহাসের যে আবেদন রয়েছে,তা কিছুটা হারিয়ে যাবে। তাই এজাতীয় ঘটনা ও দিবসকে হিজরী সন ও তারিখ দিয়েই গণনা করা উচিত। তবে হিজরী সন ঠিক রেখে কেউ যদি এর সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনকে মিলিত করে উল্লেখ করেন,সেটা দোষণীয় নয়।

হিজরী সন বা ইসলামী সনকে স্মরণ ও অনুশীলনে রাখা মুসলমানদের জন্য কতটা দরকারি?

শুধু হিজরী সন নয়,হিজরী সনের মাসগুলোর তারিখ ব্যবহারে ও চর্চায় রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কর্তব্য। মুসলমানদের হিসাব-নিকাশগুলো হিজরী তারিখ উল্লেখ করেই করা উচিত। অন্য সনের হিসাব অনুগামী হিসেবে আসতে পারে।

মনে রাখতে হবে,ইসলামী তারিখ বা চান্দ্রবর্ষের হিসাব রক্ষা করা মুসলমানদের জন্য ফরযে কেফায়া। একথা মনে করার কোনোই অবকাশ নেই যে,হিজরী সনটি আসলে আরবী বা কেবল আরবদের একটি সন; বরং এটি মুসলমানদের সন এবং ইসলামী সন। এক্ষেত্রে শুধু একটা চাঁদ দেখা কমিটি করে একটি মুসলিম-রাষ্ট্রের দায়িত্ব পুরোপুরি পালিত হয় না। বরং সব মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের উচিত,তাদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে ইসলামী বা হিজরী সনকে প্রাধান্য দেওয়া।

আমার মনে হয়,এক্ষেত্রে ওআইসি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রও এটা করতে পারে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে এর নজিরও আছে।

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন যে, চাঁদ দেখা নয়, গণনার ভিত্তিতে হিজরী সনের হিসাব রাখা এবং এজন্য স্থায়ী হিজরী ক্যালেন্ডার বানানোর উদ্যোগ নেওয়া যায়। এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

গণনার ভিত্তিতে হিজরী ক্যালেন্ডার করার বিষয়টির আসলে দুটি রূপ হতে পারে। একটি হচ্ছে, সৌরবর্ষের মতো হিজরী সনেরও ১২ টি মাস এবং প্রতি মাসের দিন ২৯/৩০ হওয়ার হিসাব করা (যা এখন প্রচলিত আছে।) এভাবে ক্যালেন্ডার করা দোষনীয় নয়। তবে সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে, এটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। অনেক আরব দেশেও এ জাতীয় ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়। পরবর্তীতে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বেশ-কম হলে তারা ক্যালেন্ডার সংশোধন করে নেন।

আরেকটিরূপ হচ্ছে, চাঁদ না দেখেই গণনার ভিত্তিতে নিশ্চয়তার সঙ্গে অগ্রিম বলে দেওয়া যে, এবার অমুক মাসের এক তারিখ অমুক বারে হবে। এ চিন্তাটা ভুল। শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে

চান্দ্রমাসের কথা উল্লেখ হয়েছে এবং সেগুলোকে গণনার মাধ্যম হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখানে ‘গণনার মাধ্যম’ বলার উদ্দেশ্য প্রথম রূপটি। অর্থাৎ সৌরবর্ষ যেমন গণনার মাধ্যম চান্দ্রবর্ষও সেভাবে গণনার মাধ্যম। কুরআন মজীদের মৌলিক জ্ঞান না থাকার কারণে কেউ কেউ ওই শব্দগুলোর দ্বারা এ কথা বুঝে নিয়েছে যে, চাঁদ দেখার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েও হিজরী বর্ষের প্রত্যেক মাসের প্রথম তারিখ ও শেষ তারিখ নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করে হিজরী ক্যালেন্ডার বানিয়ে নেওয়া উচিত। অথচ হিজরী মাসের বিষয়টি যে চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল তা একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয়।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর।-সহীহ বুখারী, হাদীসহ : ১৯০৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৮৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৯৫৫৬

কুরআন মজীদেও (সূরা বাকারা : ১৮৯) হজ্বের বিষয়কে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি হাজার বছর ধরে মুসলমানদের মাঝে মীমাংসিত। সুতরাং এ বিষয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই।

একটি মহল বিশ্বব্যাপী একদিনে ঈদ পালন ও একসঙ্গে রোযা রাখার দাবি তুলেছে। এ দেশের কিছু কিছু গ্রামে এভাবে পালিতও হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

দেখুন, সাহাবায়ে কেরামের যুগেও ইসলাম যখন বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল তখনও ভিন্ন ভিন্ন এলাকা ভেদে ঈদ ও রোযার দিন ভিন্ন হয়েছে। সিরিয়া ও মদীনায় একই দিনে ঈদ হয়নি। হাদীসের কিতাবে

لكل أهل بلد رؤيتهم

নামে একটি অধ্যায় রয়েছে। সুতরাং পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করার নামে দেশের কোনো কোনো গ্রামে অগ্রিম রোযা বা ঈদ করে ফেলা ঐক্যের নামে অনৈক্যেরই একটি নিদর্শন। তবে এসব বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করা বা পরস্পর তিক্ততার সৃষ্টি করা কিছুতেই কাম্য নয়।

মনে রাখতে হবে যে, মুসলমানদের মূল সৌন্দর্য এবং ঐক্যের ভিত্তি হচ্ছে শরীয়তের অনুসরণের মধ্যে। পুরো পৃথিবীতে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা জরুরি কোনো বিষয় নয়।

যেমনিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামায বিভিন্ন সময়ে পড়ে থাকে। যেমন আপনি যখন ফজর পড়ছেন জাপানে তা পড়া হয়ে গেছে আরো ৩ ঘণ্টা আগে। আর সৌদী আরবে তা পড়া হবে ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে। এতে তো কোনো অনৈক্য সৃষ্টি হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন